
ওরিয়ন অভিষেক: ডি-ওয়েভ-এর ২০০৭ সালের সেই প্রদর্শনী এবং বাণিজ্যিক কোয়ান্টাম সিস্টেমের জন্মলগ্ন
আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে যখন আমরা কয়েক হাজার কিউবিটের ফল্ট-টলারেন্ট কোয়ান্টাম কম্পিউটার নিয়ে কাজ করছি, তখন প্রায় দুই দশক আগের একটি ঘটনার কথা মনে পড়ে যায়। ২০০৭ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ক্যালিফোর্নিয়ার মাউন্টেন ভিউতে অবস্থিত কম্পিউটার হিস্ট্রি মিউজিয়ামে যা ঘটেছিল, তা ছিল তৎকালীন প্রযুক্তি বিশ্বের জন্য এক বিশাল চমক—অনেকের কাছে আবার চরম বিতর্কের বিষয়। কানাডিয়ান কোম্পানি 'ডি-ওয়েভ' (D-Wave) সেদিন বিশ্বের সামনে উন্মোচন করেছিল তাদের 'ওরিয়ন' (Orion) সিস্টেম, যা ছিল বিশ্বের প্রথম দাবি করা বাণিজ্যিক কোয়ান্টাম কম্পিউটার।
ওরিয়ন সিস্টেম: কী ছিল সেই প্রদর্শনীতে?
ডি-ওয়েভ-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা জর্ডি রোজ সেদিন ১৬-কিউবিটের একটি চিপ প্রদর্শন করেছিলেন। ওরিয়ন সিস্টেমটি মূলত একটি 'কোয়ান্টাম অ্যানিলার' হিসেবে কাজ করত। প্রদর্শনীতে তিনটি ভিন্ন ধরনের সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে এর ক্ষমতা দেখানো হয়েছিল: একটি প্যাটার্ন ম্যাচিং সমস্যা, সুডোকু সমাধান এবং প্রোটিন ফোল্ডিং সংক্রান্ত একটি গাণিতিক হিসাব। যদিও প্রসেসরটি মাউন্টেন ভিউতে ছিল না (এটি বার্নাবি, ব্রিটিশ কলম্বিয়া থেকে রিমোটলি কাজ করছিল), তবুও এর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী।
বিতর্ক এবং বৈজ্ঞানিক সংশয়
তৎকালীন সময়ে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের মূলধারার গবেষকদের মধ্যে ওরিয়ন নিয়ে ব্যাপক সংশয় ছিল। ডি-ওয়েভ যে 'কোয়ান্টাম অ্যানিলিং' পদ্ধতি ব্যবহার করেছিল, তা স্ট্যান্ডার্ড 'গেট-মডেল' কোয়ান্টাম কম্পিউটিং থেকে ভিন্ন। অনেক বিশেষজ্ঞ প্রশ্ন তুলেছিলেন যে, এটি কি আসলেই কোয়ান্টাম প্রভাব (যেমন এনট্যাঙ্গলমেন্ট বা সুপারপজিশন) ব্যবহার করছে, নাকি এটি কেবল একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ক্লাসিক্যাল প্রসেসর? আজ ২০২৬ সালে আমরা জানি যে, ডি-ওয়েভ-এর পথটি ছিল স্বতন্ত্র, যা অপ্টিমাইজেশন সমস্যার জন্য বিশেষভাবে কার্যকর।
বাণিজ্যিক কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের বিবর্তন
ওরিয়ন-এর সেই প্রদর্শনীই ছিল প্রথমবার কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কোয়ান্টাম প্রযুক্তিকে ল্যাবরেটরির বাইরে এনে বাজারের উপযোগী করার চেষ্টা। এর কয়েক বছর পরই ডি-ওয়েভ তাদের প্রথম বাণিজ্যিক পণ্য 'ডি-ওয়েভ ওয়ান' বাজারে আনে এবং গুগল ও নাসার মতো প্রতিষ্ঠানগুলো তা গ্রহণ করে। এই পদক্ষেপই মূলত আইবিএম, গুগল এবং আজকের জমানার কোয়ান্টাম স্টার্টআপগুলোর জন্য প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করে দিয়েছিল।
২০২৬ থেকে ফিরে দেখা
আজকের দিনে যখন আমরা কোয়ান্টাম সুপ্রিমেসি পেরিয়ে কোয়ান্টাম অ্যাডভান্টেজের যুগে বাস করছি, তখন ওরিয়ন সিস্টেমকে অনেকটা রাইট ভ্রাতৃদ্বয়ের প্রথম বিমানের সাথে তুলনা করা যায়। সেটি হয়তো আজকের সিস্টেমগুলোর মতো নির্ভুল বা শক্তিশালী ছিল না, কিন্তু সেটি প্রমাণ করেছিল যে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং কেবল তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়। ওরিয়ন-এর সেই সাহসী পদক্ষেপ না থাকলে হয়তো আজকের কোয়ান্টাম ইন্টারনেটের স্বপ্ন বা জীবন রক্ষাকারী ওষুধের দ্রুত উদ্ভাবন আরও কয়েক দশক পিছিয়ে যেত।
- মাইলফলক: ১৬-কিউবিট কোয়ান্টাম অ্যানিলার।
- মূল প্রযুক্তি: লিকুইড হিলিয়াম কুলিং এবং সুপারকন্ডাক্টিং কিউবিট।
- প্রভাব: বাণিজ্যিক কোয়ান্টাম ইকোসিস্টেমের সূচনা।
ইতিহাসের পাতায় ওরিয়ন অভিষেক তাই কেবল একটি যান্ত্রিক প্রদর্শনী নয়, বরং এটি ছিল একটি নতুন কম্পিউটিং যুগের শুভ সূচনা।


