ফিরে যান
একটি কোয়ান্টাম চিপের সাথে সংযুক্ত ঘন সমাক্ষীয় তারবিন্যাস, যা হার্ডওয়্যার স্কেলিং সীমাবদ্ধতা প্রদর্শন করে।

কেবলিংয়ের দুঃস্বপ্ন: হাজারো কিউবিট সংযোগ কেন একটি ইঞ্জিনিয়ারিং ডেড-এন্ড

June 12, 2026By QASM Editorial

২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে আমরা যখন কোয়ান্টাম প্রযুক্তির এক অভাবনীয় যুগে প্রবেশ করছি, তখন একটি অত্যন্ত সাধারণ কিন্তু কঠিন সমস্যা আমাদের বড় বড় ল্যাবরেটরিগুলোকে ভাবিয়ে তুলছে। আর তা হলো ‘কেবলিং’ বা তারের জঞ্জাল। আপনি যদি বর্তমানের একটি সুপার-কন্ডাক্টিং কোয়ান্টাম কম্পিউটারের ডাইল্যুশন ফ্রিজ বা রেফ্রিজারেটরের ভেতরে তাকান, তবে দেখবেন হাজার হাজার সোনালী রঙের কো-অক্সিয়াল কেবল ওপর থেকে নিচে নেমে এসেছে। দেখে মনে হতে পারে এটি কোনো বিশালাকার ঝাড়বাতি বা বৈজ্ঞানিক মাকড়সার জাল।

১. তাপমাত্রার ভারসাম্য ও তাপীয় বোঝা

কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের প্রধান শর্ত হলো অতি-শীতল তাপমাত্রা (মিলি-কেলভিন রেঞ্জ)। কিন্তু সমস্যা হলো, প্রতিটি কিউবিট নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আলাদা আলাদা তারের প্রয়োজন হয়। এই তারগুলো ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রার ইলেকট্রনিক্স থেকে শুরু হয়ে একদম ফ্রিজের ভেতরে কিউবিট পর্যন্ত পৌঁছায়। তার মানে, প্রতিটি কেবল বাইরে থেকে সামান্য হলেও তাপ ভেতরে বহন করে নিয়ে আসে। আমরা যখন ১০০ কিউবিট থেকে ১০০০ কিউবিটে যাওয়ার চেষ্টা করছি, তখন এই তাপীয় চাপ সামলানো ডাইল্যুশন ফ্রিজগুলোর জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ছে।

২. স্থানের সীমাবদ্ধতা ও যান্ত্রিক জটিলতা

একটি ডাইল্যুশন ফ্রিজের ভেতরে অত্যন্ত সীমিত জায়গা থাকে। প্রতিটি কিউবিটের জন্য যদি ৩ থেকে ৫টি আলাদা কেবল বা তারের প্রয়োজন হয়, তবে ১০,০০০ কিউবিটের জন্য প্রায় ৩০,০০০ থেকে ৫০,০০০ তারের প্রয়োজন হবে। এত বিশাল পরিমাণ তারের জন্য যে পরিমাণ জায়গা দরকার, তা বর্তমানে কোনো বাণিজ্যিক রেফ্রিজারেটরে নেই। একেই বিজ্ঞানীরা বলছেন ‘ওয়্যারিং বটলনেক’। এটি কেবল জায়গার অভাব নয়, বরং এক বিশাল ইঞ্জিনিয়ারিং বাধা যা প্রথাগত কোয়ান্টাম আর্কিটেকচারকে একটি ডেড-এন্ড বা মৃত গলির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

৩. সিগন্যাল ইন্টারফেয়ারেন্স ও নয়েজ

হাজার হাজার তার যখন অত্যন্ত কাছাকাছি অবস্থান করে, তখন তাদের মধ্যে ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ইন্টারফেয়ারেন্স বা ‘ক্রস-টক’ শুরু হয়। এর ফলে একটি কিউবিটের জন্য পাঠানো কমান্ড অন্য কিউবিটকে প্রভাবিত করতে পারে। কোয়ান্টাম কিউবিটগুলো অত্যন্ত সংবেদনশীল; সামান্য সিগন্যাল নয়েজও এদের স্থায়িত্ব বা ‘কোহেরেন্স টাইম’ নষ্ট করে দেয়। ফলে গণনায় ভুল হওয়ার সম্ভাবনা জ্যামিতিক হারে বেড়ে যায়।

৪. ২০২৬-এর সমাধান: ক্রায়ো-সিএমওএস (Cryo-CMOS)

ইঞ্জিনিয়াররা এখন বুঝতে পারছেন যে, ফ্রিজের বাইরে থেকে হাজার হাজার তার ভেতরে আনা কোনো টেকসই সমাধান নয়। পরিবর্তে, আমাদের এখন প্রয়োজন ‘অন-চিপ’ কন্ট্রোল সিস্টেম। অর্থাৎ, কিউবিটগুলোর ঠিক পাশেই এমন ইলেকট্রনিক্স বসাতে হবে যা অতি-শীতল তাপমাত্রায় কাজ করতে সক্ষম। একে বলা হচ্ছে ক্রায়ো-সিএমওএস প্রযুক্তি। এই পদ্ধতিতে বাইরে থেকে মাত্র কয়েকটি তারের মাধ্যমে ডিজিটাল সংকেত পাঠানো হবে এবং ভেতরের চিপটি সেই সংকেত বুঝে হাজার হাজার কিউবিটকে স্থানীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে।

উপসংহার

কেবলিংয়ের এই দুঃস্বপ্ন আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিচ্ছে: কোনো প্রযুক্তিকে স্কেল করতে হলে কেবল তার মূল ইউনিটের (কিউবিট) উন্নতি করলেই হয় না, বরং তার পারিপার্শ্বিক অবকাঠামোকেও সমানভাবে উন্নত করতে হয়। ২০২৬ সালের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আমরা নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি, পুরনো দিনের সেই তারের জঞ্জাল সরিয়ে না ফেললে সত্যিকারের কোয়ান্টাম বিপ্লব সম্ভব নয়। আমাদের পরবর্তী লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি ‘ওয়্যারলেস’ বা ‘ইন্টিগ্রেটেড’ কোয়ান্টাম আর্কিটেকচার তৈরি করা।

সম্পর্কিত নিবন্ধ