
কোয়ান্টাম কম্পিউটারের জ্বালানি সমস্যা: এই ‘সুপারমেশিন’ আসলে কতটুকু বিদ্যুৎ পান করে?
২০২৬ সাল। আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি যেখানে কোয়ান্টাম কম্পিউটার আর কেবল গবেষণাগারের বিষয় নয়, বরং ঔষধ শিল্প থেকে শুরু করে সাইবার নিরাপত্তা—সবখানেই এর বিচরণ। তবে এই অবিশ্বাস্য গতির পেছনে লুকিয়ে আছে একটি বড় চ্যালেঞ্জ: বিদ্যুৎ সাশ্রয়। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যখন কার্বন নিঃসরণ কমানোর লড়াই চলছে, তখন কোয়ান্টাম কম্পিউটারের ‘বিদ্যুৎ ক্ষুধা’ নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে বিশেষজ্ঞদের।
কেন কোয়ান্টাম কম্পিউটারের এতো বিদ্যুৎ প্রয়োজন?
সাধারণ কম্পিউটারের তুলনায় কোয়ান্টাম কম্পিউটারের কাজের ধরন সম্পূর্ণ আলাদা। এই বিশাল পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচের পেছনে মূলত তিনটি প্রধান কারণ রয়েছে:
- ক্রায়োজেনিক কুলিং (Cryogenic Cooling): বেশিরভাগ কোয়ান্টাম প্রসেসর (যেমন- সুপারকন্ডাক্টিং কিউবিট) কাজ করার জন্য পরম শূন্য তাপমাত্রার (-২৭৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস) কাছাকাছি ঠান্ডা পরিবেশের প্রয়োজন হয়। এই তাপমাত্রা মহাকাশের চেয়েও শীতল। এই প্রচণ্ড ঠান্ডা বজায় রাখতে যে রেফ্রিজারেশন সিস্টেম ব্যবহার করা হয়, তা একেকটি ছোটখাটো শহরের সমান বিদ্যুৎ খরচ করতে পারে।
- সিগন্যাল প্রসেসিং ও কন্ট্রোল ইলেকট্রনিক্স: কিউবিটগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য যে মাইক্রোওয়েভ সিগন্যাল বা লেজার ব্যবহার করা হয়, তা পরিচালনা করতে প্রচুর শক্তির প্রয়োজন হয়। যত বেশি কিউবিট যুক্ত হচ্ছে, কন্ট্রোল সিস্টেমের বিদ্যুৎ চাহিদাও তত বাড়ছে।
- ত্রুটি সংশোধন (Error Correction): কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ে ত্রুটি সংশোধনের জন্য অতিরিক্ত কিউবিট এবং প্রসেসিং পাওয়ার দরকার হয়, যা সামগ্রিক জ্বালানি খরচকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে বিদ্যুতের হিসাব
বর্তমানে ২০২৬ সালে এসে আমরা দেখছি যে, একটি সাধারণ ১০০০+ কিউবিটের কোয়ান্টাম কম্পিউটার চালাতে গড়ে ২৫ থেকে ৩০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হচ্ছে। যদিও এটি একটি সাধারণ সুপার-কম্পিউটারের চেয়ে কম মনে হতে পারে, কিন্তু সমস্যাটি হলো কোয়ান্টাম কম্পিউটারের কার্যক্ষমতা বাড়ার সাথে সাথে এই চাহিদা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে না, বরং কুলিং সিস্টেমের জটিলতা বিদ্যুৎ খরচকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
আমাদের অঞ্চলের ওপর এর প্রভাব
বাংলাদেশ বা দক্ষিণ এশিয়ার মতো অঞ্চলে যেখানে স্মার্ট গ্রিড এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে রূপান্তর চলছে, সেখানে বৃহৎ আকারের কোয়ান্টাম ডাটা সেন্টার স্থাপন করা একটি চ্যালেঞ্জ। ২০২৬ সালের জ্বালানি নীতি অনুযায়ী, প্রতিটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে এখন তাদের 'এনার্জি এফিসিয়েন্সি' রিপোর্ট প্রকাশ করতে হচ্ছে, যেখানে কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে বিস্তর বিতর্ক হচ্ছে।
উত্তরণের পথ কী?
বিজ্ঞানীরা বসে নেই। বর্তমান সময়ে বেশ কিছু নতুন প্রযুক্তির দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে:
- ফটোনিক কোয়ান্টাম কম্পিউটিং: যা কক্ষ তাপমাত্রায় কাজ করতে পারে এবং এতে বিশাল কুলিং সিস্টেমের প্রয়োজন হয় না।
- উন্নত ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স: এমন কিউবিট তৈরি করা যা তুলনামূলক উষ্ণ তাপমাত্রায়ও স্থায়ী থাকে।
- নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংহতকরণ: বড় বড় টেক জায়ান্টগুলো এখন সরাসরি সৌর বা হাইড্রোজেন পাওয়ার প্ল্যান্টের পাশে তাদের কোয়ান্টাম সেন্টার স্থাপন করছে।
উপসংহার
কোয়ান্টাম কম্পিউটিং নিঃসন্দেহে আগামী দিনের চালিকাশক্তি। তবে ২০২৬ সালে এসে আমাদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত কেবল গতির পেছনে না ছুটে একে কীভাবে টেকসই এবং পরিবেশবান্ধব করা যায়। প্রযুক্তির উন্নয়ন যদি পৃথিবীর জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়, তবে সেই সাফল্য দীর্ঘস্থায়ী হবে না। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী কোয়ান্টাম চিপ ডিজাইনই এখন আগামীর মূল গবেষণার ক্ষেত্র।


