
কোয়ান্টাম বিভাজন: কেবল ধনী দেশগুলোই কি কোয়ান্টাম যুগের সুবিধা পাবে?
২০২৬ সাল প্রযুক্তি বিশ্বের জন্য এক স্মরণীয় বছর। কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এখন আর ল্যাবে সীমাবদ্ধ কোনো তত্ত্ব নয়, বরং ফার্মাসিউটিক্যালস, ফিনটেক এবং লজিস্টিকসের মতো খাতে এটি বাস্তব পরিবর্তন আনতে শুরু করেছে। তবে এই অগ্রগতির সমান্তরালে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে আসছে: আমরা কি একটি নতুন 'কোয়ান্টাম বিভাজন' বা 'Quantum Divide'-এর যুগে প্রবেশ করছি?
প্রযুক্তির আকাশচুম্বী ব্যয় এবং অবকাঠামো
কোয়ান্টাম কম্পিউটার পরিচালনা করা সাধারণ ডেটা সেন্টারের মতো সহজ নয়। অতি-শীতল পরিবেশ (Cryogenics) এবং নির্দিষ্ট পরমাণু-স্তরের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য যে বিশাল বিনিয়োগ প্রয়োজন, তা অনেক উন্নত দেশের জন্যও চ্যালেঞ্জিং। ২০২৬ সালে এসে আমরা দেখছি যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের কয়েকটি দেশ এই খাতে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করছে। ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলো, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য নিজস্ব কোয়ান্টাম হার্ডওয়্যার তৈরি করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
উন্নত দেশগুলোর একাধিপত্য ও মেধা পাচার
বর্তমানে গুটিকয়েক টেক জায়ান্ট কোম্পানি কোয়ান্টাম ক্লাউড সার্ভিসের নিয়ন্ত্রণ করছে। যদিও তারা ক্লাউডের মাধ্যমে সেবা দিচ্ছে, কিন্তু মূল সক্ষমতা এবং অ্যালগরিদমিক নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতেই থেকে যাচ্ছে। এর ফলে দেখা যাচ্ছে যে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর সেরা গবেষক এবং প্রকৌশলীরা উন্নত দেশে পাড়ি জমাচ্ছেন, যা একটি মারাত্মক 'ব্রেইন ড্রেন' বা মেধা পাচারের সৃষ্টি করছে। যদি এই ধারা অব্যাহত থাকে, তবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা ইন্টারনেটের যুগে যে বৈষম্য আমরা দেখেছি, কোয়ান্টাম যুগে তা আরও প্রকট হবে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য কি কোনো পথ খোলা আছে?
অবশ্যই আছে। ২০২৬ সালের এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে আমাদের মতো দেশগুলোকে হার্ডওয়্যারের পেছনে না ছুটে 'কোয়ান্টাম-রেডি' সফটওয়্যার এবং অ্যালগরিদম তৈরির দিকে মনোনিবেশ করতে হবে। নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো কার্যকর হতে পারে:
- কোয়ান্টাম ক্লাউড অংশীদারিত্ব: সরাসরি সুপারকম্পিউটার না কিনে উন্নত দেশগুলোর কোয়ান্টাম ক্লাউড অবকাঠামো ব্যবহার করে স্থানীয় সমস্যা সমাধান করা।
- শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ: বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে কোয়ান্টাম মেকানিক্স এবং কম্পিউটিং শিক্ষার প্রসার ঘটানো যাতে ভবিষ্যৎ কর্মীবাহিনী প্রস্তুত থাকে।
- আঞ্চলিক সহযোগিতা: দক্ষিণ এশীয় দেশগুলো মিলে একটি যৌথ কোয়ান্টাম রিসার্চ ফান্ড গঠন করা।
উপসংহার
কোয়ান্টাম প্রযুক্তি কেবল একটি বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি নয়, এটি একটি ভূ-রাজনৈতিক হাতিয়ারও বটে। যদি বৈশ্বিক পর্যায়ে প্রযুক্তি হস্তান্তরের সঠিক নীতিমালা প্রণয়ন করা না হয়, তবে ধনী দেশগুলো এবং বাকি বিশ্বের মধ্যে ব্যবধান এতটাই বেড়ে যাবে যে তা পূরণ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। ২০২৬ সালে আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত—প্রযুক্তির এই অফুরন্ত শক্তি যেন মুষ্টিমেয় কয়েকজন নয়, বরং গোটা মানবজাতির কল্যাণে ব্যবহৃত হয়।


