ফিরে যান
একটি উজ্জ্বল কোয়ান্টাম প্রসেসর যা ডিজিটাল তালা এবং বিশ্বের মানচিত্র দ্বারা পরিবেষ্টিত।

কোয়ান্টাম কোল্ড ওয়ার: কেন রাষ্ট্রগুলো প্রথম ক্রিপ্টো-ব্রেকার তৈরির প্রতিযোগিতায় নেমেছে

June 4, 2026By QASM Editorial

কোয়ান্টাম কোল্ড ওয়ার: ২০২৬-এর নতুন ভূ-রাজনীতি

২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে আমরা লক্ষ্য করছি যে, বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য আর কেবল সামরিক সরঞ্জাম বা পারমাণবিক শক্তির ওপর নির্ভর করছে না। বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় কৌশলগত সম্পদ হলো ‘কোয়ান্টাম কম্পিউটিং’। গত দুই বছরে আইবিএম (IBM) এবং গুগলের মতো টেক জায়ান্টগুলো তাদের কোয়ান্টাম প্রসেসরের সক্ষমতা কয়েক হাজার কিউবিটের (Qubits) ওপরে নিয়ে গেছে। এই অভাবনীয় অগ্রগতির ফলে শুরু হয়েছে এক নতুন 'কোয়ান্টাম কোল্ড ওয়ার' বা কোয়ান্টাম স্নায়ুযুদ্ধ।

ক্রিপ্টো-ব্রেকার কী এবং কেন এটি বিপজ্জনক?

এই যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এমন একটি কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরি করা যা প্রচলিত আধুনিক এনক্রিপশন পদ্ধতিগুলোকে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ভেঙে ফেলতে সক্ষম। বর্তমান বিশ্বের প্রায় সব ডিজিটাল নিরাপত্তা ব্যবস্থা, যেমন—অনলাইন ব্যাংকিং ট্রানজেকশন, সরকারি গোপন নথি, সামরিক যোগাযোগ এবং ব্যক্তিগত মেসেজিং মূলত RSA বা ECC-এর মতো গাণিতিক অ্যালগরিদমের ওপর ভিত্তি করে তৈরি।

সোর-এর অ্যালগরিদম (Shor’s Algorithm) ব্যবহার করে একটি শক্তিশালী কোয়ান্টাম কম্পিউটার এই নিরাপত্তা দেওয়ালগুলো মুহূর্তেই গুঁড়িয়ে দিতে পারে। একেই বিশেষজ্ঞ মহলে বলা হচ্ছে ‘ক্রিপ্টো-ব্রেকার’। যে রাষ্ট্র প্রথম এই সক্ষমতা অর্জন করবে, তারা কার্যত অন্য রাষ্ট্রের কয়েক দশকের জমানো এনক্রিপ্টেড ডাটা পড়ার ক্ষমতা লাভ করবে। একে সাইবার নিরাপত্তার ভাষায় বলা হচ্ছে ‘Store Now, Decrypt Later’ (SNDL) স্ট্র্যাটেজি। অর্থাৎ, শত্রুপক্ষ এখন তথ্য চুরি করে জমিয়ে রাখছে এই আশায় যে, ২০২৬ বা ২০২৭ সালের মধ্যে তারা কার্যকর কোয়ান্টাম কম্পিউটার দিয়ে সেগুলো ডিক্রিপ্ট করতে পারবে।

প্রতিযোগিতার মূল খেলোয়াড় কারা?

  • যুক্তরাষ্ট্র: সিলিকন ভ্যালি এবং ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির মাধ্যমে তারা তাদের হার্ডওয়্যার শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে কয়েক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে।
  • চীন: বেইজিং এবং সাংহাইতে কোয়ান্টাম কমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক এবং স্যাটেলাইট ভিত্তিক কোয়ান্টাম ডিস্ট্রিবিউশন (QKD) তৈরির মাধ্যমে তারা হ্যাকিং-মুক্ত যোগাযোগে বিশ্বে নেতৃত্ব দিচ্ছে।
  • ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ভারত: তারা তাদের নিজস্ব 'কোয়ান্টাম মিশন' প্রকল্পের মাধ্যমে ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব রক্ষার চেষ্টা করছে যাতে করে তারা সুপারপাওয়ারগুলোর ওপর নির্ভরশীল না হয়।

সুরক্ষার নতুন দেয়াল: পোস্ট-কোয়ান্টাম ক্রিপ্টোগ্রাফি (PQC)

২০২৬ সালের এই সংকটময় মুহূর্তে বিশ্বজুড়ে সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা এখন ‘পোস্ট-কোয়ান্টাম ক্রিপ্টোগ্রাফি’ (PQC) নিয়ে কাজ করছেন। NIST-এর দেওয়া নতুন স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী অনেক ব্যাংক এবং টেক প্রতিষ্ঠান তাদের সিস্টেম আপডেট করা শুরু করেছে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, এখনো বিশ্বের ৮০ শতাংশের বেশি ডাটা পুরনো এনক্রিপশনে রয়ে গেছে, যা কোয়ান্টাম আক্রমণের মুখে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

উপসংহার

কোয়ান্টাম কম্পিউটিং মানবসভ্যতার জন্য যেমন ক্যানসার নিরাময় বা নতুন ম্যাটেরিয়াল আবিষ্কারের আশীর্বাদ নিয়ে আসতে পারে, তেমনি এটি বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য এক বিশাল হুমকি। ২০২৬ সালের এই কোয়ান্টাম স্নায়ুযুদ্ধ কেবল প্রযুক্তির শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই নয়, এটি মূলত তথ্যের ওপর আধিপত্য বজায় রাখার লড়াই। যে দেশ এই যুদ্ধে প্রথম 'ক্রিপ্টো-ব্রেকার' তৈরি করতে পারবে, আগামী কয়েক দশক তারাই ডিজিটাল বিশ্বের অদৃশ্য চাবিকাঠি নিয়ন্ত্রণ করবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ